ফারুকী-তিশা
সিংগুলার নাম্বার থেকে প্লুরাল
কাজীবাড়িতেই যাচ্ছি। সঙ্গে আলোকচিত্রী খালেদ সরকার। কনের নাম নুসরাত ইমরোজ তিশা। বরের নাম মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। কাজীবাড়িটি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়।
তবে এই কাজীবাড়িতে বিয়ে পড়ানো হয় না। এখানে শুটিং করা হয়। চমৎকার পরিবেশ। এক পাশে ছোট্ট একটি পুকুর। পুকুরঘাটে বসে ফারুকী একটু পর পর পানির বোতলে চুমুক দিচ্ছেন। চোখেমুখে প্রশান্তি। বেশ হাসিখুশি তিনি। বললেন, 'এত দিনের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে, তাই আনন্দটা একটু বেশিই বলতে পারেন।'
তিশা তখনো শুটিংয়ে ব্যস্ত। ১৮ মে, মঙ্গলবার। পড়ন্ত বিকেল। ফারুকীর কাছে প্রশ্ন করা হলো, আপনি না বলতেন, আমি আমার নাটকের নায়িকাদের সঙ্গে কাজের বাইরে কোনো সম্পর্ক রাখি না?
ফারুকী একটু থেমে গেলেন। বললেন, 'এখনো তাই বলছি। কাজের বাইরে আমি কোনো সম্পর্ক রাখি না। আর এই যে প্রেমটা বলছেন, এটা তো একটা কাজ। একটাই প্রেম করেছি। একটাই বিয়ে করতে যাচ্ছি।'
'আমরা তো জানি, আপনি এর আগে আরও দুটি প্রেম করেছেন?'
'নাটকের নায়িকাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে প্রেম করেছিলাম। এটা তো তিশা জানে। সেটা এখন অতীত।'
'কেন, একজন সংগীতশিল্পীর সঙ্গে প্রেম ছিল না আপনার?' 'সে তো আর আমার নাটকের নায়িকা ছিল না। আর সেটা প্রেম কি না, জানি না?'
'প্রেম কী?' 'এটা বুঝেছি তিশার সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে। এই ধরুন, আমি তিশার বাসার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিশাকে ফোনে বললাম, তুমি বারান্দায় এসে দাঁড়াও। একটু দেখব। অথচ তখন রাত এবং বেশ অন্ধকার। তিশার মুখটাও দেখতে পেলাম না। অনুভব করলাম কেউ একজন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। আমি চলে গেলাম। তাতেই যেন অনেক শান্তি। এটাই আসলে প্রেম।'
কথাগুলো বলার সময়ই ধানখেত পেরিয়ে মেঠোপথ ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে এলেন তিশা।
প্রচণ্ড গরমের কারণে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কিন্তু তাতেও কোনো ক্লান্তি নেই তাঁর মধ্যে। ফারুকীর পাশে গিয়ে বসলেন।
তিশার কাছে প্রশ্ন—আচ্ছা দুজনে দুজনার দিকে কবে তাকালেন?
তিশা বললেন, 'নাটকের শুটিংয়েই আসলে আমাদের প্রথম দেখা হয়। পারাপার নামে একটি টেলিফিল্মের শুটিং করে ফারুকী আমাকে নিয়ে। কিন্তু তখন আমদের মধ্যে এ রকম কোনো সম্পর্কই তৈরি হয়নি। ৬৯ নাটকে এর পরে কাজ শুরু করলাম। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম ফারুকীর মন একটু খারাপ থাকত। জানলাম, যার সঙ্গে ওর প্রেম ছিল সেটি ভেঙে গেছে। ফারুকী আমাকে ওর সব কথা বলত। আমি ওকে বললাম, এটা কোনো ব্যাপার না। এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। আমিও আমার জীবনের কিছু কথা ওকে বলতাম। তারপর ফারুকীকে বললাম ধূমপান না করার জন্য। দেখলাম ফারুকী ধূমপান ছেড়ে দিল। আমাদের মধ্যে টেলিফোনে কথা হতো। আমি একটু একটু বুঝতাম যে, ফারুকী আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু কেউই তখন ভালোলাগার বিষয়টি প্রকাশ করিনি।'
ফারুকী তিশাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'এবারে আমি বলি। নিখোঁজ সংবাদ নাটকের শুটিং করছিলাম। সেদিন আমি মনে মনে ঠিক করলাম, আজ আমি তিশাকে ভালোলাগার কথা বলব। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারছিলাম না। মনে মনে ভাবলাম, যে গাড়িতে করে যখন শুটিং-স্পটে যাব, তখন বলব। কিন্তু মেজাজটা খারাপ হলো তখনই যখন দেখলাম যে, তিশার মা ওই গাড়িতে উঠে বসেছেন। মেজাজ এতই খারাপ হলো যে, সবার সঙ্গে রাগারাগি শুরু করে দিলাম। সবাই তো অবাক, যে আজ কী হলো ফারুকীর? এর মধ্যে চঞ্চলের মায়ের চরিত্রে যিনি অভিনয় করছেন, তিনি বারবার তিশাকে বলতে শুরু করলেন, কইরে আমার বেটার বউ, কোথায় গেলি? এই কথাটি বারবার শুনতে ভালো লাগল না। একপর্যায়ে খেপে গিয়ে বলাম, কী ব্যাপার বারবার বেটার বউ, বেটার বউ বলছেন কেন? আসলে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যে মেয়েটি হবে আমার বউ, অথচ সেই কথাটি বলতে পারছি না। আর অন্যজন তার বেটার বউ বলে অস্থির।
'একপর্যায়ে তিশাকে একটু নিরিবিলি পেলাম। তিশা বেশ শান্ত ভঙ্গিমায় আমার কাছে জানতে চাইল, ঘটনা কী? আমি ঢোক গিলতে শুরু করলাম। এমন অবস্থা যে কয়েক গ্লাস পানি পর্যন্ত খেতে হলো। তারপর চোখ বন্ধ করে বললাম, তিশা আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং বিয়ে করতে চাই। তুমি আমার বউ হবা?
'তিশা শুনল এবং শান্ত ভঙ্গিতেই বলল, আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তিশা এরপর এমন লজ্জা পেল যে, আমার সামনে আর আসে না। কিন্তু ওকে বারবার দেখতে ইচ্ছা করছিল।'
তিশা ফারুকীকে পছন্দ করলেন কী কী কারণে?
তিশা বললেন, 'আমি ওর মধ্যে যে সততা দেখেছি, সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি খেয়াল করে দেখেছি যে, আমার কাছে সে সব সময় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। তাই আমি মানুষ ফারুকীকে পছন্দ করেছি।'
একই প্রশ্নের উত্তরে ফারুকী বললেন, 'তিশার মধ্যে আমি যে মায়া দেখেছি, ওর মধ্যে পরিবারের সবাইকে মানিয়ে নেওয়ার যে ক্ষমতা আছে, সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছে।'
২০০৫ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে দুজনের মন দেওয়া-নেওয়া শুরু হয়েছিল। সেই প্রেম পরিণতি পাচ্ছে ১৬ জুলাই ফারুকী আর তিশার বিয়ের মধ্য দিয়ে। দুজনেই জানালেন, এখন যেভাবে আমরা কাজ করছি, বিয়ের পরও সেভাবেই কাজ করব। ফারুকী বললেন, নিউজিল্যান্ডে যাব হানিমুন করতে।
তিশার ডাক এসেছে। দিনের আলো কমে আসতে শুরু করেছে। তিশা বললেন, 'যাই, শেষ দৃশ্যের শুটিংটা করে আসি।' তিশা চলে গেলেন।
সাটুরিয়ার কাজীবাড়িতে এইভাবে, প্রথম কোনো সংবাদমাধ্যমের সামনে, ফারুকী ও তিশা জানিয়ে দিলেন তাদের কাজীবাড়ি যাওয়ার দিনক্ষণ পরিকল্পনা! বিয়ের দৃশ্য দিয়ে শেষ করা হয় বহু ছায়াছবি। কিন্তু বাস্তবজীবনে কিন্তু এরপরেই শুরু হয় আসল কাহিনী। তিশা-ফারুকী, থার্ড পারসন সিংগুলার নাম্বার থেকে আপনারা দুজনেই হচ্ছেন পু্লুরাল, আপনাদের জীবনের এই নতুন পর্ব শুভ হোক, বলে রওনা দিই ঢাকার পথে। বাইকে ধূলি ওঠে, এই সময়কেই তো বলে গোধূলি।
...
|
Saturday, May 22, 2010
|
0 comments